Back
উত্তরের ধানের ভাণ্ডার ও বিশ্ব ঐতিহ্য সমপুর মহাবিহার

নওগাঁ জেলা

বরেন্দ্র ভূমির প্রাণকেন্দ্র ও প্রাচীন স্থাপত্যের লীলাভূমি

মূল পরিচিতি

নওগাঁ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি কৃষি প্রধান ও ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ জেলা। বরেন্দ্র ভূমির অংশ হিসেবে পরিচিত এই জেলাটি তার ব্যাপক শস্য উৎপাদন এবং সুপ্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। 'নও' (নতুন) এবং 'গাঁ' (গ্রাম) শব্দ থেকে এই জেলার নামকরণ করা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এটি অনেক রাজবংশের স্মৃতিবিজড়িত প্রাচীন জনপদ।

উপজেলাসমূহ (১১টি)

নওগাঁ সদর
আত্রাই
বদলগাছী
মান্দা
ধামইরহাট
মহাদেবপুর
নিয়ামতপুর
পোরশা
সাপাহার
পত্নীতলা
রানীনগর

ঐতিহাসিক গুরুত্ব

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত 'সোমপুর মহাবিহার' বা পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এটি ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site)। এছাড়া সুলতানি আমলের স্থাপত্য কুসুম্বা মসজিদ এ জেলার গৌরবের আরও একটি বড় অংশ।

কৃষি ও অর্থনীতি

ধানের ভাণ্ডার: নওগাঁকে বলা হয় বাংলাদেশের অন্যতম 'ধানের ভাণ্ডার'। দেশের মোট চাল চাহিদার এক বিশাল অংশ এই জেলা থেকে আসে। এখানকার চালের আড়তগুলো সারা দেশে বিখ্যাত।

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি: ধান ছাড়াও এখানে প্রচুর গম, আলু, ভুট্টা ও আমের চাষ হয়। বর্তমানে উন্নত জাতের গরুর ডেইরি খামার গড়ে উঠছে বরেন্দ্র এলাকাগুলোতে।

ভৌগোলিক অবস্থান

অবস্থান: রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তর-পশ্চিমে এবং রাজশাহী থেকে উত্তরে বরেন্দ্র অঞ্চলের কোলে অবস্থিত।

সীমানা:
  • উত্তর: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও দিনাজপুর জেলা
  • দক্ষিণ: নাটোর ও রাজশাহী জেলা
  • পূর্ব: বগুড়া জেলা
  • পশ্চিম: চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ও পশ্চিমবঙ্গ (ভারত)

আয়তন: প্রায় ৩,৪৩৫ বর্গ কিমি।

যোগাযোগ ব্যবস্থা

সড়কপথ: ঢাকা-রাজশাহী এবং বগুড়া হয়ে নওগাঁর সাথে সারা দেশের চমৎকার সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। আধুনিক বাস সাভিসের মাধ্যমে খুব সহজেই যাতায়াত করা যায়।

রেলপথ: নওগাঁর ওপর দিয়ে প্রবাহিত আত্রাই নদী সংলগ্ন এলাকায় এবং সান্তাহার রেলওয়ে জংশন এ জেলার রেল যোগাযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান

প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থাপত্য

সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর) অষ্টম শতাব্দীতে পাল রাজবংশের দ্বারা নির্মিত এক বৌদ্ধ বিহার কমপ্লেক্স, যা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।
কুসুম্বা মসজিদ কালো পাথরে খোদাই করা অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এক দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, যা সুলতানি আমালের ইতিহাস বহন করে।
বলিহার রাজবাড়ি প্রাচীন জমিদার আমলের অসাধারণ কারুকার্যপূর্ণ এক রাজপ্রাসাদ, যা নওগাঁর গরিমা স্মরণ করায়।

প্রকৃতি ও নদী

আত্রাই নদী ও ছোট যমুনা নদীর পাড়ের শান্ত পরিবেশ এবং নৌকায় ভ্রমণের মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের টানে।
পতিসর (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কাচারী বাড়ি ও জাদুঘর এখানে অবস্থিত, যেখানে বসে কবি বহু বিখ্যাত কবিতা ও গান রচনা করেছেন।
ধামইরহাট আলতাদীঘি বিশাল আয়তনের অদিঘি এবং সংলগ্ন শালবন প্রকৃতির এক অপরূপ দান।

বিখ্যাত সাহিত্যিক ও ব্যক্তিত্ব

কালজয়ী বিশ্বকবি ও সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্মৃতি - পতিসর) বিশ্বকবি তাঁর জমিদারি পরিচালনার জন্য দীর্ঘসময় নওগাঁর পতিসরে কাটিয়েছেন। এখানেই তিনি 'বিদায় অভিশাপ', 'চৈতালি' কাব্যগ্রন্থ এবং 'বলাই' গল্পের মতো অনেক অমূল্য সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। পতিসরে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ঘর ও ব্যবহার্য দ্রব্যাদি আজও রয়েছে।
দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বিখ্যাত দার্শনিক, সাহিত্যিক ও জাতীয় অধ্যাপক। তাঁর চিন্তাধারা ও লেখনীতে বাংলার মাটির ঘ্রাণ এবং বিশ্বস্ত দর্শন সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে।

সাংস্কৃতিক ও ইতিহাসবিদ

মোহাম্মদ মোকাররম হোসেন নওগাঁর কৃতি সন্তান এবং প্রখ্যাত গবেষক। এ অঞ্চলের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব উন্মোচনে তাঁর লেখনীর অবদান অনস্বীকার্য।
আঞ্চলিক লোকসংগীত শিল্পীগণ নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে গম্ভীরা ও বাউল সুরের এক অনন্য ধারা বহমান, যা এ অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ভবিষ্যৎ প্যানেল ও কৌশল

কৌশলবিদ

নওগাঁকে কেন্দ্র করে 'এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন' গড়ে তোলা অত্যন্ত ভালো একটি কৌশল হবে। উন্নত চাল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিং শিল্পের মাধ্যমে অর্থনীতিকে বহুগুণ শক্তিশালী করা সম্ভব।

সমালোচক

বরেন্দ্রের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই সেচের জন্য পানির সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং নদীর পানির সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর এখনই জোর দিতে হবে।

উদ্ভাবক

পাহাড়পুর ও পতিসরকে কেন্দ্র করে 'কালচারাল ট্যুরিজম সার্কিট' তৈরি এবং পর্যটকদের জন্য আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা পাহাড়পুরকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান পর্যটন গন্তব্য করে তুলবে।